সুরের আকাশ রিক্ত করে প্রয়াত দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়

“এ ঘর শূন্য করে, বাঁধন ছিন্ন করে”, ছিল তাঁর গানের লাইন। বাংলা গানের স্বর্ণযুগের সেই বিশাল ‘ঘর’ ছিল তাঁর কাজের জায়গা, আপামর বাঙালিকে গানের বাঁধনে বেঁধেছিলেন তিনি। সেই সব উজ্জ্বল স্মৃতিকে পিছনে ফেলে প্রয়াত হলেন সঙ্গীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। সোমবার দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। প্রায় ১৫০০ গান গেয়েছিলেন তিনি যার মধ্যে অর্ধেকের বেশী রবীন্দ্রসঙ্গীত। বাংলা ছায়াছবির পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও গান গেয়েছেন।
গানের জগতে তাঁর পথচলা শুরু সলিল চৌধুরির সঙ্গেই। আই পি টি এ আন্দোলনের প্রথম সারিতেই থাকতেন তিনি। সলিলের সুরে ‘পল্লবিনী গো সঞ্চারিনী’ এবং ‘ শ্যামলবরণী ওগো কন্যা’ ছিল সুপার হিট। সলিল চৌধুরি তাঁকে নিয়ে যান মুম্বইতেও। সেখানে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ডুয়েট গান দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ‘হনিমুন’,’মায়া’ ও ‘সপনো সুহানে’ ছবিতে। ‘সোনার খাঁচা’ সহ বহু বাংলা ছবিতে তাঁর গান জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে মহালয়ার ভোরে রেডিওর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে ‘মাগো তুমি জাগো’ ছিল আক্ষরিক অর্থেই শারদ উৎসবের ঘুম ভাঙ্গানিয়া।
পদ্মভূষণ ও বঙ্গবিভূষণে সম্মানিত প্রবাদপ্রতিম এই শিল্পীর প্রয়াণে বাংলার সঙ্গীত ও শিল্প জগত শোকস্তব্ধ। তাঁর শেষযাত্রায় দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ছুঁয়ে যাবেন রবীন্দ্র সদন। বহু অনুষ্ঠান তিনি করেছেন যে প্রেক্ষাগৃহে। গেয়েছেন সেই গান-‘সেই তো আপনজন, হৃদয়মাঝে যে থাকে অনুক্ষণ”।
প্রয়াত অভিনেতা গৌতম দে

প্রয়াত অভিনেতা গৌতম দে ৷ বর্ষীয়ান এই অভিনেতা গৌতম দে কাজ করেছেন রবি ঘোষ, মনোজ মিত্র, দুলাল লাহিড়ি,দিলীপ রায়, লিলি চক্রবর্তী, শুভেন্দু চট্টপাধ্যায়ের মত বিখ্যাত অভিনেতাদের সঙ্গে। । ইন্দর সেন পরিচালিত টেলি সিরিয়ালেঅভিনয়ের মাধ্যমে টেলিভিশন দুনিয়ায় পা রাখেন গৌতমবাবু। গৌতমবাবু ‘জন্মভূমি’ সিরিয়ালে অভিনয় করে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পান। গৌতম দে ‘জন্মভূমি’ ছাড়াও অভিনয় করেন ‘তিথির অতিথি’, ‘লাবণ্যের সংসার’, ‘খুঁজে বেড়াই কাছেরমানুষ ,‘ধ্যাত্তেরিকা’, ‘এ কোন সকাল’ সহ বেশ কিছু সিরিয়ালে। বেশ কয়েকটি ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন। গৌতম দে প্রথম জীবনে চুটিয়ে নাটক করেছেন। গৌতম দে’র বিখ্যাত নাটকগুলি হল- ‘সাবাস পেটোপাঁচু’, ‘দম্পতি’,‘বৈশাখি ঝড়’। পরিবার সূত্রে খবর দীর্ঘদিন ধরে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন ৷ তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। সূত্রের খবর, অসুস্থতানিয়েই তিনি শুটিং করছিলেন ৷ ‘করুণাময়ী রানি রাসমণী’, ‘হৃদয়হরণ বিএ পাস’ নামে দুটি ধারাবাহিকে কাজ করছিলেনতিনি। সোমবার সকাল ৭টা নাগাদ শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।
প্রাক্তন মন্ত্রী নিরুপম সেনের জীবনাবসান
প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতা, পলিট ব্যুরোর প্রাক্তন সদস্য, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী নিরুপম সেনের জীবনাবসান হয়েছে। সোমবার ভোর পাঁচটা দশ মিনিটে বিধাননগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়েই হাসপাতালে পৌঁছেছেন পার্টি নেতৃত্ব। আজ তাঁর মরদেহ কলকাতার পিস হাভেনে শায়িত থাকবে। বুধবার কমরেড নিরুপম সেনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। নিরুপম সেনের জন্ম ১৯৪৬ এর ৮ অক্টোবর। তাঁর শৈশব কেটেছে বর্ধমান জেলার গোবিন্দপুরে। সেখানকার রায়পুর হাইস্কুলে তাঁর পিতা ভুজঙ্গভূষণ সেন শিক্ষকতা করতেন। ঐ স্কুলেই নিরুপম সেন পড়াশুনা করেন এবং স্কুল ফাইনাল পাস করেন। এরপর ১৯৬১ সালে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজে ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে। সেই সময়েই তিনি ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন এবং দ্রুত জনপ্রিয় ছাত্র নেতা হয়ে ওঠেন। ছাত্রাবস্থাতেই নিরুপম কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে নিরুপম সেন বর্ধমান জেলায় ছাত্র ফেডারেশনের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়েছেন এবং তারপরে কলা বিভাগেও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শিক্ষান্তে তিনি প্রথম জীবনে কিছুদিন শিক্ষকতার কাজ করেন। প্রথমে বর্ধমানের সি এম এস হাইস্কুলের প্রাতঃবিভাগে এবং তারপরে টিকরহাট হাইমাদ্রাসায় কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে তিনি পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী ১৯৬৮ সালে নাদনঘাটে বর্ধমান জেলার দশম সম্মেলনে নিরুপম সেন সিপিআই (এম)-র জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৯ সালে বর্ধমান জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব পান নিরুপম সেন। সেই সময় থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সি পি আই (এম) বর্ধমান শহর কেন্দ্রে জয়ী হতে পারেননি। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে বর্ধমানে পার্টির পুনর্গঠনে শ্রমিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ইত্যাদির আন্দোলনে মধ্যবিত্ত অংশের মানুষকে সংগঠিত করতে নিরুপম সেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮২ সালের নির্বাচনে এরফলে সিপিআই (এম) এই কেন্দ্রে জয়ী হয়। পরের নির্বাচনে ১৯৮৭ সালে বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে সিপিআই (এম) প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন নিরুপম সেন। সেই প্রথম তাঁর বিধানসভা প্রবেশ। ১৯৮৫ সালে নিরুপম সেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য হন। ১৯৯৫ সালে নিরুপম সেন সিপিআই (এম)-র রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় সিপিআই (এম)-র ষোড়শ পার্টি কংগ্রেসে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের পার্টি কংগ্রেসে তিনি সিপিআই (এম)-র পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে নিরুপম সেন ফের বর্ধমান (দক্ষিণ) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। সেবার তিনি বামফ্রন্ট সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালেও তিনি ঐ কেন্দ্র থেকেই পুনর্নির্বাচিত হন। এবারও তিনি শিল্প ও বাণিজ্য দফতরের মন্ত্রী হন। পরবর্তীকালে তিনি এরসঙ্গে বিদ্যুৎমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিকাঠামো উন্নয়নে এবং বিদ্যুৎ পর্ষদকে অর্থনৈতিকভাবে সুদৃঢ় করাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখিয়েছিলেন। তাঁর লেখা ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’, ‘বিকল্পের সন্ধানে’, ‘বর্তমান সময় ও আমাদের পার্টি’, ‘অর্থচিন্তা’, ‘ডাঙ্কেল প্রস্তাব ও ভারতের সার্বভৌমত্ব’, ‘চীনের ডায়েরি’, ‘সময়ের দর্পণে কমিউনিস্ট ইশতেহার’, ‘সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায়’, ‘প্রসঙ্গ মতাদর্শ’, ‘কেন এই বিতর্ক’, ‘শ্বেত পারাবতের সন্ধানে’, ‘অশান্ত কাশ্মীর’ ইত্যাদি বইগুলি অত্যন্ত জনপ্রিয়। ২০১৩ সালে নিরুপম সেন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সুস্থ হলেও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। ফলে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে সরে যান। ২০১৫ সালের পার্টি কংগ্রেসে তিনি সিপিআই (এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য হন। অসুস্থ অবস্থাতেও নিরুপম সেন হুইল চেয়ারে বসে পার্টির অনেক সভা সম্মেলনে যোগ দিতেন। সোমবার ভোর পাঁচটা দশ মিনিটে বিধাননগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

No comments